আজকের দিনটা আমার বিশেষভাবে মনে থাকবে। ভালো কিছুর জন্য অবশ্যই নয়, বরং আমার ছেলের অপমানের জন্য। আমি শুধু এই ভয়টার কারনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম দেশ ছেড়ে আমার ছেলেকে নিয়ে সারাজীবনের জন্য চলে যাবো। কারন আমি আরো আগেই বুঝেছিলাম যে এরকম ঘটনারই সম্মুখীন হতে হবে আমার ছেলেকে যদি আমি দেশে থাকি।

আজকে এ্যালেন, মানে আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধু, আলীর বাবা মা আমাদেরকে দাওয়াত করেছিলো। সপরিবারেই দাওয়াত করেছিলো। গিয়েছিলামও সবাই, আলীফকে সহ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে।

সামাজিক গল্প করার এক পর্যায়ে, আমার ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপারে অংকেল, মানে আলীর বাবা জিজ্ঞাসা করলে আমি বলি, আলীফ স্পেশাল স্কুলে পড়ত, কিন্তু এই মুহূর্তে সে পড়ে না। আমি নির্দ্বিধায় বলেছিলাম কারন আমি আমার ছেলের ব্যাপারে একেবারেই লজ্জিত নই।

কিন্তু খেয়াল করলাম, তারপর থেকেই উনার আলীফের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পালটে গেলো যেটা তার অঙ্গভঙ্গি এবং আচরন দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিলো।

খেতে বসার সময় রুমা আলীফকে নিয়ে আলাদা একটা চেয়ারে বসে কারন ডাইনিং টেবিলে জায়গা ছিলো না। একটা সোফার সামনে ছোট একটা টেবিলে ওকে খেতে বসানো হয়। আলীফ ছোট মানুষ, স্বভাবতই ও একটু বেশীই ছটফটে স্বভাবের। তাছাড়া অন্যান্য ছোট বাচ্চাদের মতই সেো কোল্ডড্রিংক্স অনেক বেশী পছন্দ করে।

খাওয়ার পরে ওর হাতে ছোট একটা স্প্রাইটের বোতল ছিলো। আমার ছোট মেয়ে আভাকে ওর দায়িত্বে রেখে রুমা কেবল খেতে বসেছিলো। এরই মধ্যে আলিফ স্প্রাইটের বোতল থেকে স্প্রাইট সোফার উপরে ফেলে দেয়, যা অন্যান্য স্বাভাবিক বাচ্চা হলেও এরকমটা হতে পারত।

আলীর বাবা, অর্থাৎ আংকেল রেগে গেলেন এবং একটা কথা বললেন যেটা তার কাছাকাছি থাকা মানুষগুলো বিশেষ করে রুমা শুনতে পেলো। কথাটা ছিলো, "এরকম ছেলের হাতে এসব জিনিষ দেয়াটাই ভুল হয়েছে।"

কথাটার মধ্যে যেমন তাচ্ছিল্য ছিলো, তেমন ছিলো ঘৃণা। 

রুমা কথাটা নিতে পারেনি। খেতে বসেই কেঁদে ফেলেছিলো। আমিও কথাটা ওর কাছে থেকেই শুনেছি। আমিও নিতে পারছিলাম না। আলীফের কোন অপমান বা অসম্মান আমি বা রুমা, কেউই নিতে পারি না। আমি একটা ফোনের কথা বলে নিচে চলে গিয়েছিলাম, শুধু নিজেকে একটু সামলে নেয়ার জন্য।

বাড়িতে ফেরার পথে আমি রুমাকে নিয়ে আলাদাভাবে কিছুক্ষন ড্রাইভ করে ওকে আশ্বস্ত করার চেষ্ঠা করি। ওর মনকে শক্ত করতে বলি। আমি বলেছি যে, আমি জানতাম যে এরকম পরিস্থিতি আলিফকে ফেইস করতে হবে যদি আমরা বাংলাদেশে থাকি। কারন এখানকার মানুষগুলো আসলে এখনও সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি।

সত্যি বলতে কি, আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, আমার আপন মায়ের পেটের ভাই, আমার অনেক আদরের ছোট ভাইয়ের আলীফের প্রতি একটা ব্যাবহার, আমাকে ইন্সট্যান্ট ডিসিশন নিতে সাহায্য করেছিলো যে, আমি দেশে থাকব না, কারন আলীফ এখানে প্রতি পদে পদে লাঞ্ছিত হবে, অপমানিত হবে। যতই সে সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠুক না কেন।

যেখানে নিজের আপন জনের কাছে থেকেই আমার ছেলে এমন ব্যাবহার পেতে পারে, সেখানে এইসমস্ত লোকজনতো পরই। এরাতো এরকম করবেই।

বাংলাদেশের কোন মানুষ, বা কোন বাঙ্গালী এখনও এত বড় মন মনসিকতার হয়ে উঠতে  পারেনি যে আলিফের মত কোন বাচ্চাকে তারা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারে।

আমি জানি, আমার আলীফ একদিন ঠিকই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। আমি আমার আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং আস্থা রেখেই এই কথা বলতে পারি। এজন্যই আমি এইসমস্ত আপমানের উত্তরের জন্য মুখে কাউকে কিছু বলতে চাই না, কারন আমি জানি, এর উত্তর সময়ই দিয়ে দেবে। আমি বিশ্বাস করি, একটা সময় আসবে যখন অন্য সবাই আলীফকে দেখিয়ে বলবে, "যদি কিছু হতেই হয়, তাহলে আলীফের মতই হও।"

আজকে বাবা মা হিসেবে আমি আর রুমা মনে মনে যে কষ্টটা পেয়েছি, জানিনা এর দীর্ঘশ্বাস কারো গায়ে গিয়ে কি আছড়ে পড়বে কিনা।